
অটোপাসের বছর (২০২০) ছাড়া বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় এবারের ফলাফল তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় কম। একইসঙ্গে গতবারের মতো এবারও ইংরেজিতে খারাপ ফলের কারণে গড় পাসের হারে অন্য বোর্ডের চেয়ে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। আর সামান্য ব্যবধানে শুধুমাত্র দুই শিক্ষাবোর্ডকে টপকাতে পেরেছে চট্টগ্রাম বোর্ড।
এদিকে গতবারের চেয়ে কম হলেও এবার পুরো সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় গত চার বছরের চেয়ে জিপিএ-৫ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বোর্ডের কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতবার সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থাকায় পাসের হার বেশি ছিল। তবে এবার তুলনামূলক আগের চেয়ে পাসের হার বেড়েছে। কিন্তু প্রতি বছরের ন্যায় তিন পার্বত্য জেলায় পাসের হার কম ও ইংরেজিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় সার্বিক ফলাফলে প্রভাব পড়েছে এবারও। যার কারণে গড় হারের দিকে পিছিয়ে গেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। এমনকি কমেছে জিপিএ-৫ও।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ ফলাফল প্রকাশ করে বলেন, এ তিন জেলায় দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষকের সংকট থাকায় সব সময়ের মতো সার্বিক ফলাফলে প্রভাব পড়ে। কিন্তু তুলনামূলক বিচার করলে এবারের ফলাফল নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট আছি। জিপিএ-৫ এবং পাসের হারে কম মনে হলেও আসলে বিগত বছরের তুলনায় ভালো করেছে আমাদের শিক্ষার্থীরা।’
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবার পাসের হার ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ। যেখানে গতবার ছিল ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এবার পাসের হার ২০২১ সালের চেয়ে প্রায় ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। অটোপাসের বছর (২০২০) ছাড়া গতবার এসএসসির পাসের হার পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ছিল, যা ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০২০ সালে অটোপাস থাকায় শতভাগ পাস। ২০১৯ সালে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এবারও পিছিয়ে তিন পার্বত্য জেলা—
প্রতিবারের মতো এবারও ফলাফলে পিছিয়ে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা। রাঙামাটিতে এ বছর পাসের হার ৭৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে কম, ৬৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে বান্দরবানে পাসের হার ৮১ দশমিক ২০ শতাংশ। এই তিন জেলার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ১২ হাজার ৬৭০ জন। এরমধ্যে ছাত্র ৫ হাজার ৫৬৪ জন। ছাত্রী ৭ হাজার ১০৬ জন। গতবছর মোট জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১৩ হাজার ৭২০ জন। ২০২০ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১২ হাজার ১৪৩ জন। ২০১৯ সালে ২ হাজার ৮৬০ জন এবং ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬১৩ জন।
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর, তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজার মিলিয়ে এবার পরীক্ষার্থী ছিল ৯৩ হাজার ৯৯৭ জন। পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯১ হাজার ৯৬০ জন। বহিষ্কার করা হয় পাঁচজনকে। বাকি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পাস করেছে ৭৪ হাজার ৩২ জন। ফেল করেছে ১৭ হাজার ৯২৮ জন।
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ; যা গতবার ছিল ৯৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলার পাসের হার ৭৬ দশমিক ১২ শতাংশ; যা গতবার ছিল ৮৮ দশমিক ২২ শতাংশ। মহানগরসহ চট্টগ্রাম জেলার পাসের হার ৮২ দশমিক ৭১ শতাংশ; যা গতবার ছিল ৯০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এক বিষয়ে ফেল বাড়ায় কমেছে পাস—
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের মাঝে এক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ হাজার ৯৩৯ জন। ফেল করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ঝরে গেছে। তবে ইংরেজি প্রথম পত্রে ঝরেছে ৮ হাজার ১২ জন। দ্বিতীয় পত্রে ঝরেছে ১৪ হাজার ৭২৯ জন। শতাংশ হিসেবে ইংরেজি প্রথমপত্রে প্রায় ১০ এবং দ্বিতীয় পত্রে ১৭ শতাংশেরও বেশি পরীক্ষার্থী ঝরে গেছে। এছাড়াও অর্থনীতি প্রথম পত্রেও প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী খারাপ ফল করেছে।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে কম পরীক্ষার্থী পাস করেছে অর্থনীতি প্রথম পত্রে যা ৭৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে ৮২ দশমিক ৯৬ ও প্রথম পত্রে ৯০ দশমিক ৭৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। যুক্তিবিদ্যায় ৮৯ দশমকি ৬০ শতাংশ পাস করেছে। বাকি অধিকাংশ বিষয়ে পাসের হার ৯০ শতাংশের উপরে; যা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি।
এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী এক বিষয়ে খারাপ করেছে। তারমধ্যে ইংরেজি বিষয়ে বেশি। এজন্য গত বছরের চেয়ে আমাদের পাসের হার কিছুটা কমেছে। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে ফেলের হার কম। তাছাড়া এবার সিলেবাস সংক্ষিপ্ত না হয়ে সব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে। পাসের হার কিছুটা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটার প্রভাবও আছে।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে ফলাফল প্রসঙ্গে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম দেখা গেলেও পাঁচ বছরের হিসেবে ভালো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ফলাফলে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট আবার সন্তুষ্ট না এটা বলা কঠিন। তিনটি পার্বত্য জেলার কারণে পাসের হারে বোর্ড পিছিয়ে পড়ে। ওই তিন জেলায় পাসের হার কম। এটাই মূলত কারণ।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ আরও বলেন, ‘পাহাড়ের জনগোষ্ঠী একটু পিছিয়ে পড়া। তাদের আরও পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দরকার। এখন তাদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি সুফল মিলবে।
পাসের দিক থেকে এবারও এগিয়ে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থীরা। বিজ্ঞানে ৯১ দশমিক ৩০ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৮৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং মানবিকে পাসের হার ৭৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গতবছরের তুলনায় মানবিকে পাসের হার এবার কমেছে ১৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিজ্ঞানে কমেছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় পাসের হার কমেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে—
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবছরও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার বেশি। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে এবার ছাত্রী ৪৭ হাজার ৫৪০ জন এবং ছাত্র ৪৪ হাজার ৪২০ জন ছিল। ছাত্রী পাসের হার ৮২ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ছাত্র ৭৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৯ দশমিক ১৬ শতাংশ করে ছাত্রী ও ছাত্র কলেজের গণ্ডি পার হতে পারেনি। পাসের হারের পর জিপিএ-৫ এর দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। মোট ১২ হাজার ৬৭০ জন জিপিএ-৫ পাওয়াদের মধ্যে ছাত্র ৫ হাজার ৫৬৪ জন। ছাত্রী ৭ হাজার ১০৬ জন।
তবে এবছর কলেজভিত্তিক শতভাগ পাসের ক্ষেত্রে ফলাফল মূল্যায়ন হলেও প্রকাশ করেনি চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। এজন্য পাসের ক্ষেত্রে শীর্ষ দশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা হয়নি। এর কারণ হিসেবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলছেন, ‘পরীক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে পাসের হারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২ জন, দেখা গেল ২ জনই পাস করেছে। তখন শতভাগ পাসে ওই প্রতিষ্ঠান আসবে। কিন্তু যেটার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। তাই এবার আমরা এই ধরনের মূল্যায়ন ফলাফল প্রকাশ করতে চাইছি না।