প্রকাশিত হয়েছেঃ জুন ২০, ২০২৩ সময়ঃ ৭:২১ অপরাহ্ণ
আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)।।
ময়মনসিংহের ভালুকায় আইন অমান্য করে উপজেলার সর্বত্রই জমির শ্রেণী পরিবর্তনের হিড়িক পড়েছে। বনবিভাগের উচু টিলা কেটে নিয়ে মহাসড়কের দু’পাশের জলাশয়, বিভিন্ন খাল বিল ভরাট হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। তাছাড়া ১০০ ভেকু ও দুই শতাধিক ড্রামট্রাক দিয়ে দিনরাত মাটি বহনের কারণে একদিকে যেমন শহর ও গ্রামাঞ্চলের সরকারী বেসরকারী কাঁচা-পাকা রাস্তার মারত্মক ক্ষতি হচ্ছে, তেমন অপরদিকে বনাঞ্চলের গাছপালা উজাড় হয়ে উচুটিলা কেটে নিয়ে মাটি বিক্রির কারণে হুমকীর সম্মুখিন হয়ে পড়েছে জীব বৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘূরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভালুকা পৌরএলাকা, জামিরদিয়া মাষ্টারাবাড়ি, সিডষ্টোর, ডাকাতিয়া, কাচিনাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০ টি ভেকু ও দুই শতাধিক ড্রাম ট্রাক রয়েছে। আর ওইসব ভেকু ও ড্রামট্রাক দিয়ে দিনরাত নিয়ম বহির্ভূতভবে বনবিভাগের উচু টিলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূমির শ্রেণী পরিবর্তণ করে চলেছে একটি সিন্ডিকেট। স্থানীয়রা জানান, উপজেলার বারশ্রী গ্রামের মনিরুজ্জামান মনির, মাহবুবুল আলম ওরফে টুপি আলম, জাহাঙ্গীর, মোহর আলী, মনির হোসেন, মোকলেছু রহমান, খাইরুল ও সুজন, উজ্জল মিয়া ও রুবেলের দুটি করে ভেকু ও একাধিক ড্রামট্রাম এবং কাদির ড্রাইভারের ৪টি, কামাল ও মারুফের ৫ টি, শামীমের ৫ টি, মতিউর রহমান মতির (বর্তমান ইউপি মেম্বার) ৪ টি, পৌর এলাকার রনি ও খসরুর বেশ কয়েকটি ভেকু ও ড্রামট্রাক, রিপন, নজরুল এবং নুরুদ্দিনের একটি করে ভেকুসহ শতাধিক ভেকু ও দুই শতাধিক ড্রামট্রাক রয়েছে। আর এসব অসাধূ ব্যক্তিরা স্থানীয় বনবিভাগকে ম্যানেজ করে প্রশাসনের নাকের ঢগায় তাদের ভেকু ও ড্রামট্রাক দিয়ে বনবিজ্ঞপ্তিত উচু টিলা কেটে নিয়ে সন্ধার পর থেকে সারারাতব্যাপি দাপটের সাথে মহাসড়কসহ সরকারী ও বেসরকারী কাঁচা-পাকা রাস্তা ব্যবহার করে মাটি বিক্রির মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ফলে একদিকে যেমন বনঅধ্যুসিত এলাকার শত শত একর বনভূমির গজারীসহ বিভিন্ন প্রজাতীয় গাছ উজাড় হয়ে মাটি কেটে নেয়ার ফলে ভূমির শ্রেণী পরিবর্তণ হয়ে উচুটিলা নিন্মভূমিতে পরিনত হচ্ছে। তেমনি অপরদিকে মাটি বহনের কারণে সরকারী বেসরকারী কাঁচা-পাকা রাস্তার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হবিরবাড়ি মৌজার বনবিজ্ঞপ্তিত বিভিন্ন দাগের গণ গজারী বনের বড় বড় গাছগুলো রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে ও আগুণ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে উচু টিলার মাটি কেটে নিয়ে বিলুপ্ত করে দেয়া হচ্ছে। আর ওইসব স্থানে বর্তমানে আম বাগান ও বৃদ্বা আশ্রমসহ বিশাল আকারের বিনোদন কেন্দ্র শোভা পাচ্ছে।
এদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দু’পাশের নিচুভূমি ও জলাশয়সহ আশপাশের খাল-বিলগুলোর অধিকাংশই ভরাট হওয়ার পথে। আর এসব ভরাটকৃত জলাশয় বিভিন্ন কোম্পানী ও ব্যক্তি মালিকানায় দখলে চলে যাচ্ছে। উপজেলা হবিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত লাউতি নদী ও বিলাইজুরী খালটির বেশির ভাগই বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকগন ভরাট করে সিমানাপ্রচীর ও স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলেছেন। সম্প্রতি ওই খাল দু’টি খনন করতে গিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বেকায়দায় পড়েন এবং প্রাচীরের ভেতরই খনন কাজ করতে হচ্ছে। এতে সরকারের বরাদ্দকৃত ওই টাকা খাল খননে তেমন কাজে আসবে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কারণ কিছুদিন পর হয়তো দেখা যাবে ওই খালটি ভরাট হয়ে কোম্পানীর পেটেই চলে গেছে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিরুনীয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ূম রিপন ও শহিদুল ইসলাম সরকারের নেতৃত্বে গারোইলেরটেক ভিটার বেশ কয়েকটি বাড়িসহ গারোইল ও দোইল্লা বিল থেকে ১৫০ বিঘা জমি ক্রয় করে উইন্ডি গ্রæপের সাইনবোর্ড টানিয়ে ফসলি জমি ও সরকারের খাসভূমি অবৈধভাবে ভরাট করা হচ্ছে। কোন অনুমতি ছাড়াই শতাধিক ড্রাম ট্রাক ও ভেকু দিয়ে পাশের চান্দরাটি গ্রামের বাজাইল বিলের খাস জলাশয়সহ বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি কেটে নিয়ে বিল দু’টি ভরাট করছেন। এতে মাটি বহনের কারণে ভালুকা-গফরগাঁও আঞ্চলিক সড়কসহ অভ্যন্তরীন বিভিন্ন কাঁচা-পাকা অধিকাংশ সড়ক মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
চারটি ভেকু ও দুই ড্রামট্রাকের মালিক আব্দুল কাদির ড্রাইভার জানান, ভালুকায় শতাধিক ভেকু ও দুই শতাধিক ড্রামট্রাক রয়েছে। রাস্তা ঘাটের ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, তাদের এসব ড্রামট্রাক ও ভেকু বেশিরভাগই ভাড়ায় পরিচালিত হয়ে থাকে। যারা মাটির ব্যবসা করেন, তারাই ক্ষীতর বিষয়ে জবাবদিহি করবেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এরশাদুল আহমেদ জানান, ভূমির শ্রেণীর পরিবর্তণ একটি দন্ডনীয় অপরাধ, তাছাড়া ড্রামট্রাকে মাটি বহনের কারণে সরকারী বেসরকারী কাঁচা-পাকা রাস্তার ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

