আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)।।
ময়মনসিংহের ভালুকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে খিরু ও লাউতি নদি এবং বিলাইজুরি খালের খনন কাজে ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পাড় ঘেষে মাটি রাখার কারণে একদিকে যেমন শত শত কৃষকের বোরো ধান ও ফসলী জমির ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি অপরদিকে বর্ষায় বা একটু বৃষ্টিতেই ওই মাটি পূণরায় নদিতে পড়ে আগের ন্যায় ভরাট হয়ে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য বেহাতের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডিং ন্যাচারাল (জেভি) ১৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের কাপরগড় শিমূলতলী থেকে উজানে মল্লিকবাড়ি ঘুনিরঘাট ব্রীজ পর্যন্ত ২৪.৩ কিলোমিটার খিরু নদি, মেসার্স এমডি নাসির উদ্দিন মোল্লাহ ৫ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪.৬ কিলোমিটার লাউতি নদী ও মেসার্স বাবর এন্ড আদারস ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪.৯০০ কিলোমিটার বিলাইজুরি খাল খনন কাজ বাস্তবায়ন করছেন। গত ২১ জানুয়ারী শনবিার পারুলদিয়া বাজারে খিরু নদির খননকাজের উদ্বোধন করা হয়।
সরেজমিন নদী পাড়ের লোকজন ও কৃষি জমির মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় ভালুকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই খিরু ও লাউতি নদী ছিলো প্রবাহমান। কিন্তু উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা দুই শতাধিক শিল্প কারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য সরাসরি খিরু ও লাউতি নদী এবং বিলাইজুরি খালে ফেলার কারণে পলি জমে দিন দিন ভরাট হয়ে যায়। নদীর খনন কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা খুশি হলেও কাজের ধীরগতি ও অনিয়মের কারণে এমনকি এলোপাতারী ভাবে মাঠি ফেলে শত শত মন উঠতি বোরো ধানসহ ফসলি জমির ক্ষতি করার কারণে বিভিন্ন এলাকার জমির মালিকদের মাঝে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জমির মালিকদের অভিযোগ, খননের কারণে নদী ও খালের নাব্যতা ফিরে এলে জমিতে সেচ দেয়ার সুযোগ ও বন্যার হাত থেকে বাঁচার যে আশা করেছিলেন, তা নিরাশায় পরিনত হতে চলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সার্বিক তথ্য উল্লেখ করে নদিপাড়ে বেশ কয়েকটি সিটিজেন চার্ট টাঙ্গানোসহ নদীর তলদেশে ২০ মিটার প্রস্তে খনন করে মাটি নদির পাড় থেকে অন্তত ৪০ ফুট দূরে মাটি ফেলার নিয়ম থাকলেও, তা না করে ঠিকাদার তার মনগড়াভাবে দায়সারা কাজ করে নদির পাড় ঘেষে মাটি ফেলার কারণে একটু বৃষ্টি হলে বা আসন্ন বর্ষায় পুরো মাটি পূণরায় নদীতে পড়ে গিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। এতে সরকারের ওই বিপুল অঙ্কের টাকা তেমন কোন কাজে আসবেনা বলে স্থানীয়রা জানান। তাছাড়া, নদি ও খালের একপাশ থেকে খনন কাজ শুরু করে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত করার কথা থাকলেও ধীরগতিতে ও প্রায়ই বন্ধ রেখে কিছুদূর পর পর খনন কাজ করার কারণে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এমনকি বর্ষার আগে কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
উপজেলার মেদুয়ারী পানিবান্দা গ্রামের নদিপাড়ের জমি মালিক ফয়সাল আহম্মেদ ফাইজুল জানান, খিরু নদি যেনতেনভাবে খনন করা হচ্ছে এবং ওইসকল মাটি অপরিকল্পিতভাবে ফেলে তার দুই একর জমি ও উঠতি বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। তাছাড়া, তার এলাকার আব্দুল ওয়াদুদ মিয়ার ৮ কাঠা, সামাদ মিয়ার ৮ কাঠা, সফিক মিয়ার ৫ কাঠা, মহর আলীর ৫ কাঠা, পাঁচগাও গ্রামের জামাল উদ্দিনের ৪ কাঠা ও রফিকুল ইসলামের ১০ কাঠাসহ ওই এলাকার অন্তত দুই শতাধিক কৃষকের বোরো ফসল ও জমির ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ক্ষতির ব্যাপারে উপসহকারী কৃষি অফিসার কামরুজ্জামানকে জানানো হলেও তিনি কোন সদোত্তর দেননি।
উপসহকারী কৃষি অফিসার কামরুজ্জামান জানান, নদি খনন কাজে মাঠি ফেলে ফসলী জমি ও ধানের ক্ষতির বিষয়ে তিনি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছেন, কিন্তু যেহেতু সরকারী কাজ তাই তাদের তেমন কিছু করনীয় নেই। উপজেলা কৃষি অফসারের সাথে কথা বলার জন্য তিনি এই প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জেসমিন জাহান জানান, নদি ও খাল খনন কাজে মাটি ফেলে ধানি জমি বা বোরো ধানের ক্ষতির বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তাই ওই ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারছেন না বলে জানান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডিং ন্যাচারাল (জেভি) এর প্রতিনিধি মো: আরিফুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে তার ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। টাস্কফোর্স কাজের দেখাশোনা করছেন, এখানে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। সিডিউল অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে, মাটি যে স্থানে ফেলানো হচ্ছে, ওইখানেই থাকবে, সড়ানো কোন খরচ তাকে দেয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, দুই কোটি টাকার একটি বিল পেয়েছেন, তাই কাজ করতে একটু ধীরগতি পালন করতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী গৌতম বিশ^াস অনিয়মের কথা অস্বীকার করে জানান, ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ কাজ হয়েছে। খননের মাটি নদি পাড়ে রাখার নিয়ম নেই। খনন কাজ চলমান আছে। কাজ শেষে নির্দিষ্ট স্থানে খননের মাটি সরিয়ে নেয়ার হবে। সিটিজেন চার্ট দু’চারদিনের মধ্যে নদিপাড়ে লাগানো হবে বলে তিনি জানান।
ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখলাক উল জামিল মুঠোফোনে জানান, আমাদের দপ্তরের লোকজনদের তত্বাবধানে খনন কাজ ঠিকঠাক ভাবেই চলছে। ঈদের ছুটির জন্য বেশ কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিলো। ইতোমধ্যে ২৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, খিরু ও লাউতি নদী এবং বিলাইজুরি খাল খননে এলাকাবাসী কৃষি জমিতে সেচসহ বিভিন্ন ধরণের সুফল পাবেন।