জুয়েলার্স থেকে ছিনতাইকৃত স্বর্ণ উদ্ধার : মালিক বহাল তবিয়তে

শেয়ার করুন :

স্টাফ রিপোর্টার, দিগন্তবার্তা ডেক্স।।
ময়মনসিংহের ভালুকায় আপন জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকারের দোকান থেকে মধ্যরাতে ছিনতাইকৃত ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হলেও চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘন্টাব্যাপী দেনদরবারের পর রহস্যজনক কারনে দোকান মালিকের বিরুদ্ধে আইনী কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বেশ কিছুদিন আগে চোরাই স্বর্ণ উদ্ধার হওয়ার অভিযোগে তারই ভাই মডার্ণ জুয়েলার্সের মালিক রতন কৃষ্ণ কর্মকার পুলিশের হাতে ধরা পরে দেড় মাস হাজতবাস করে জামিনে আসেন। বার বার অপরাধি হিসেবে সনাক্ত হওয়ার পরও কিভাবে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক ভাবে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
পুলিশ জানায়, গত ১৪ আগস্ট লক্ষীপুর সদরে জনৈক চম্প কর্মকার মোটরসাইকেল যোগে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলসহ সাড়ে ৯ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত ছিনতাই মামলার আসামী পারভেজ ও সিফাতের শিকারোক্তিতে পুলিশ জানতে পারেন স্বর্ণগুলো ভালুকায় একটি স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে ভালুকা মডেল থানার এসআই আব্দুর রহিম ও কনস্টেবল হানিফের সহযোগীতায় লক্ষীপুর মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ কাউসারউজ্জামনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ভালুকা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌরসদরে অবস্থিত শহীদ নাজিম উদ্দিন সড়কের দক্ষিণ পাশে সরকার টাওয়ার ১৪৪ নম্বর দি আপন জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল কর্মকারের কাছ থেকে ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু ঘন্টাব্যাপী স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীর মাধ্যমে দেন দরবারের পর রহসজন্যক কারণে তাকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি।
আপন জুয়েলার্সের মালিক অরুণ কৃষ্ণ কর্মকার জানান, পাশের কাইয়ূম মার্কেটের হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পাল ১৩/১৪ দিন আগে তার কাছে ৫ ভরি স্বর্ণা বন্ধক রেখে দুই লাখ টাকা নেয়। পরে পুলিশের উপস্থিততে তার টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণাগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পাল দোকন বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছেন।
একটি সূত্র জানায়, লক্ষীপুর সদরে স্বর্ণাঙ্কার ছিনতাই হওয়ার পর গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার এমসির বাজার খানবাড়ি মোড়ের বাড়িওয়ালা আব্দুল খালেকের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে আব্দুল খালেক স্বর্ণালাঙ্কারগুলো স্থানীয় রূপসী জয়েলার্সের মালিক মিজানুর রহমানের কাছে বিক্রি করতে গেলে তিনি স্বর্ণালঙ্কারগুলো গলিয়ে ভালুকা পৌরসভার শিমুলতলী এলাকার হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পালের কাছে বিক্রি করেন।
রূপসী জয়েলার্সের মালিক মিজানুর রহমানুর রহমান জানান, বাড়িওয়ালা আব্দুল খালেক তার কাছে প্রায় সাড়ে ৯ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আসেন। কিন্তু তার কাছে টাকা না থাকায় তাকে সাথে নিয়ে ভালুকা হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পালের কাছে বিক্রি করা হয়।
প্রকাশ থাকে যে, ৪/৫ মাস আগে চোরাই স্বর্ণ উদ্ধারের অভিযোগে অভিযুক্ত শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকতারের ভাই মডার্ণ জুয়েলার্সের মালিক রতন কৃষ্ণ কর্মকার পুলিশের হাতে ধরা পরে দেড় মাস হাজতবাস করে জামিনে আসেন।
নাম প্রকাশ না করার সর্তে স্থানীয় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, এতাদিন ব্যবসা করে আমরা চলতে পারিনা। আর তারা রাতারাতি একাধিক বাড়ি, কয়েক কোটি টাকার জমি ও তিনি ভাই তিনটি বিশাল দোকান কি করে গড়ে তুলতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, ওই তিন ভাইয়ের সাথে সোনা চুরাচালান সিন্ডিকেট, চোরচক্র ও ছিনতাইকারীদের যোগসূত্র থাকতে পারে। আর তা না হলে বার বার এসব অপরাধমূলক কাজে তারা কেনো সনাক্ত হয়। এ সব বিষয়ে ওই তিন ভাইকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনার ঝড় উঠে।
এসব ব্যাপাওে অভিযুক্ত আপন জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকারের বড় ভাই লিপি জুয়েলার্সের মালিক অরুন কৃষ্ণ কর্মকার জানান, তারা ভালুকায় অবস্থানকালিন সময়ে কোন ধরণের অবৈধ ব্যবসা করেননি। তার দুই ভাই রতন ও শ্যামলের এক টাকাও পুঁজি নেই। কতোজনে কতো কথা বলবে, তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই।
বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির ভালুকা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও গঙ্গা জুয়েলার্সের মালিক প্রশান্ত কুমার সাহা জানান, ঘটনাটি খুবই দু:খ্যজনক। বার বার তাদের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগ কেনো, এটা আমরাও চিন্তা করি। তারা বড় ব্যবসায়ী, তাদের ব্যাপারে আমি কি আর বলবো। তিনি বলেন, এক ভরি স্বর্ণ ক্রয় বিক্রয় করা হলে ৫ থেকে ৬’শ টাকা লাভ হয়। তারা কিভাবে এতো বড় ব্যবসায়ী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।
লক্ষীপুর মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ কাউসার উজ্জামান জানান, গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারীর শিকারোক্তিতে ভালুকা আপন জুয়েলার্স থেকে ছিনতাইকৃত ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু স্বর্ণগুলো আপন জুয়েলার্সের মালিকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিলো, তাই আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ভালুকা মডেল থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, ঘটনাটি লক্ষীপুরের, থানার সহযোগীতা চাওয়াই আমরা পুলিশ দিয়ে সহযোগীতা করেছি।
উল্লেখ্য, গত ৩০ বছর আগে তিন ভাই, অরুণ কৃষ্ণ কর্মকার, রতন কৃষ্ণ কর্মকার ও শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকার টাঈগাইলের কালিহাতি উপজেলার মগরা গ্রাম থেকে ভালুকায় আসেন প্রায় শূণ্য হাতে। গত ৩০ বছরে তারা তিন ভাই গফরগাঁও রোডের শিমুলতলায় সরকার টাওয়ারে অরুন কৃষ্ণ কর্মকার লিপি জুয়েলার্স, রতন কৃষ্ণ কর্মকার মাডর্ণ জুয়েলার্স ও শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকার আপন জুয়েলার্স নামে তিনটি বিশাল আকারের স্বর্ণের দোকান গড়ে তুলেন। তাদের তিন ভাইয়ের দোকানে বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি তারা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। এমনকি ২ নম্বর ওয়ার্ডে তিন শতাংশ জমির উপর তিনতলা বাড়ি ও পাশেই ৫ শতাংশ জমিসহ দুই ইউনিটের ৬ তলা বাড়ি ক্রয় করেন। দু’টি বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্য জমিসহ প্রায় তিন কোটি টাকা হবে বলে স্থানীয়রা জানান।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করা যাবে না!!