শেখ আজিজুল হক, নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর থেকে।। 

গাজীপুর মহানগরের প্রত্যন্ত এলাকা গাছা থানার পলাশোনা, মুদিপাড়া ও ইছরকান্দি মৌজার প্রায় ৯৮ ভাগই কৃষি ও জলাভূমি। অত্র এলাকা নিয়ে রাজউকের ডিটেল এরিয়া প্ল্যান-ড্যাব’র প্রস্তাবনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি কোম্পানি খাল-বিল, ডুবা-নালা ও কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘটিয়ে শিল্প কারখানা ও আবাসন হাতে নিয়েছে। কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই পলাশোনা-মুদিপাড়া-ইছরকান্দি খাল ঘেঁষে বিস্তৃর্ণ ফসলিমাঠ ও জলাশয় কংক্রিটের সুউচ্চ ওয়াল দিয়ে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে। এতে অত্র এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক গঠন বিনষ্ট হয়ে জীব বৈচিত্র চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
গাজীপর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭,৩৮, ৩৯ নিয়ে রাজউক প্রণীত ড্যাবের ‘গাজীপুর উপ-অঞ্চল-৫ (গাছা থানা)’ গঠিত। ড্যাবে অত্র এলাকায় ২২.৩৩ ভাগ ভূমিকে কৃষিভূমি হিসেবে এবং ৩.৯৭ শতাংশ ভূমি জলাশয় হিসেবে সংরক্ষণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, ‘দ্রুত নগরায়ণ হবার কারণে প্রয়োজনীয় নগর বর্ধায়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা উচিত। এই উপ-অঞ্চলের পূর্ব দিকে তুরাগ নদ অবস্থিত। এই নদ ও জলাশয়গুলো সংরক্ষণ করা উচিত।’ ড্যাবে নদ, খাল, জলাশয় ও কৃষিভূমি বলতে গাছা থানার পলাশোনা, মুদিপাড়া ও ইছরকান্দি মৌজাকেই নির্দেশ করা হয়েছে এবং অত্র এলাকার প্রাকৃতিক ভূমিবিন্যাস সংরক্ষনের তাগাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানী ড্যাবের এ নির্দেশনাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। এব্যাপারে জেলা প্রশাসন, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তর একেবারে নির্বিকার। বরং জেলা প্রশাসন এসব জমি বিভিন্ন কোম্পানিকে ক্রয় করার অনুমতি দিয়ে পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত কোম্পানিগুলোকে প্রকারান্তরে সহযোগিতা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ইছরকান্দি, মুদিপাড়া, পলাশোনা ও সন্নিহিত বাদেপলাশোনা মৌজা ঘেঁষেই তুরাগ নদ প্রবহমান। নদের পশ্চিম পাশে আশুলিয়া ও পূর্ব পাশে গাছা থানার বিস্তৃর্ণ নিম্মাঞ্চল। যা শুকনো মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় থাকে পানির নিচে। অত্র এলাকার প্রায় ৯৮ ভাগ ভূমি কৃষি ও জলাভূমি। পলাশোনা, মুদিপাড়া ও ইছরকান্দি মৌজার অধিকাংশ জমি একফসলি। এগুলোতে বছরে একবার বোরো ধান আবাদ হয়। এলাকার জনবসতি সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বিভিন্ন রবি শস্য চাষ হয়। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ পেশায় কৃষক ও মৎস্যজীবী। কিন্তু ‘নীড়’ নামের একটি কোম্পানি বিস্তৃর্ণ ফসলিমাঠ ও জলাভূমির ভেতর দিয়ে প্রবহমান খালের তীর ঘেঁষে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ও প্রায় ১৫ ফিট উঁচু ওয়াল নির্মাণ করায় এলাকাবাসীর আদি পেশা এখন বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘নীড়’ নামের আলোচিত কোম্পানি আইটি ইউনিভার্সিটি করার নামে বিগত ২০০৯ সালে নগরীর প্রত্যন্ত পলাশোনায় প্রধানসড়কের পাশে একখন্ড টিলাজমি ক্রয় করে। এর পর এলাকার কম দামী কৃষি ও জলাভূমির ওপর কোম্পানিটির নজর পড়ে। কৃষি ও জলাভূমিতে ক্রমেই তাদের বিস্তৃতিলাভ ঘটতে থাকে। পলাশোনার আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘কোম্পানিটি বিভিন্ন দাগে কিছু কিছু জমি কিনে চার দিক থেকে সুউচ্চ বাউন্ডারি নির্মাণ করছে এবং মাঝের জমির মালিকদেরকে কম দামে তাদের কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করছে। খালঘেঁষে বাউন্ডরি নির্মাণ করায় আমরা এলাকাবাসী নির্মাণ কাজে বাধা দিতে পারছি না। কারণ তাদের বাউন্ডারি খালের জমিতে পড়েছে। খালের মালিকানা সরকারের। সরকারি লোকজন এগিয়ে না এলে কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়ার সাধ্য আমাদের নেই। বাধা দিলে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিবে।’
পলাশোনার আদি বাসিন্দা শ্রী চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমার নিজের কোন আবাদি জমি নেই। অন্যের জমি বর্গায় চাষ করি। নীড় কোম্পানির কাছে এসব জমির মালিকানা হস্তান্তরের পর এখন আপাততঃ আমিই বর্গাচাষ করছি। আমার মতো আরো অনেকেই নীড় কোম্পানির জমি আবাদ করেন।’ পলাশোনার অপর কৃষক আব্দুজ জব্বার বলেন, ‘নীড় কোম্পানি অত্র এলাকায় প্রায় আড়াইশ বিঘা জমি ক্রয় করেছে। বর্তমানে প্রায় ৩০ বিঘার মত জমি কোম্পানি নিজস্ব কাজে ব্যবহার করছে। বাকি জমি এলাকার প্রান্তিক কৃষকরা এখনো চাষাবাদ করছেন এবং কোম্পানির ডাঙ্গায় (ডোবায়) এলাকাবাসী এখনো নিয়মিত মাছ শিকার করছেন।’
এদিকে নীড় কোম্পানির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আব্দুর রব জানান, পলাশোনা-গাছা-বড়বাড়ি সড়কের পাশে ক্রয়কৃত টিলাজমিতে আইটি ইউটিভার্সিটি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের কোম্পানির। আর বাকি সব জমিতে কৃষি ভিত্তিক বিভিন্ন খামার গড়ে তুলা হবে। কী কী খামার গড়ে তুলা হবে এবং তাদের কোম্পানির প্রোফাইলে কী আছে তা দেখতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো সেভাবে পরিকল্পনা নেয়া হয়নি এবং খামারের প্রোফাইলও তৈরি হয়নি। খাল ঘেঁষে কৃষিজমিতে সুদীর্ঘ উঁচু বাউন্ডারি নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খালের জমি বাদ রেখেই আমাদের জমির সীমানা হিসেবে দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে।
এদিকে এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে টঙ্গী সার্কেল সহকারী কমিশনার(ভূমি) তামান্না রহমান জ্যোতি বলেন, ডিমারগেশন (সীমানা নির্ধারণ) না করা পর্যন্ত পলাশোনার ওই খাল ঘেঁষে বাউন্ডারি নির্মাণ কাজ আপাততঃ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এর পরও তারা কাজ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইন অনুযায়ী খালের তীরবর্তী ৫০ গজের মধ্যে কোন অবকাঠামো নির্মাণ করা যায় না বলেও তিনি জানান। কোম্পানির নামে কৃষি ও জলাভূমি ক্রয়ের অনুমোদন দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এব্যাপারে ডিসি অফিস ভালো বলতে পারবে। কোম্পানির নামে জমি কেনার অনুমোদন ডিসি অফিস দিয়ে থাকে।’
এব্যাপারে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব ও এলএ ) মোছাম্মৎ হাসিনা আক্তার বলেন, কোম্পানিকে জমি ক্রয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে কৃষি বা জলাভূমি ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের কোন অনুমতি দেয়া হয়নি। কোন কোম্পানি পূর্বানুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এব্যাপারে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নয়ন মিয়া বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমার ওয়াটসঅ্যাপে ছবিগুলো পাঠান। আমি দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
#