রফিকুল ইসলাম খান, গফরগাঁও প্রতিনিধি।।
সৌদি আরবের আল খারিজ শহরে ইরানের মিসাইল হামলায় নিহত ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের ভরভরা গ্রামের প্রবাসী আবদুল্লাহ আল মামুন (৩৫) জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) বাদ আসর নামাজের পর তার নিজ বাড়িতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়।
উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মাকসুদুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে সৌদী আরবের ডাক্তার সোলাইমান আল হাবিব হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহতের মরদেহ আজ সোমবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। সেখানে তার মরদেহ গ্রহণ করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী।
মামুনের মরদেহটি প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও দাপ্তরিক কাজ শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহটি দুপুর ২টায় দিকে তার গ্রামের বাড়ি গফরগাঁওয়ের ভরভরা নিয়ে আসা হয়। এসময় তার বাড়িতে আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। লাশ দেখে বাবা শহীদুল ইসলাম শওদাগর ও মা শাহেদা খাতুন বিলাপ করে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুনের জানাজা ও দাফন কার্যক্রমে অংশ নেন গফরগাঁও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমির সালমান রনি, গফরগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ মশিউর রহমান, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা আশরাফুল ইসলাম, রসুলপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মাকসুদুল হাসান, পৌর বিএনপির সাবেক আহবায়ক ফজলুল হক, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শাহ আব্দুল্লাহ আল মামুন, গণমাধ্যম কর্মী, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ।
এর আগে, গত ৮ মার্চ ইফতারের আগ মুহূর্তে আল খারিজ শহরের আল তোয়াইক বলদিয়া কোম্পানির একটি শ্রমিক ক্যাম্পে মিসাইল বিস্ফোরণে আবদুল্লাহ আল মামুন (৩৫) সহ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত এবং গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে মামুনের শরীরের প্রায় ৭২ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।
পরে ১৭ মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে সৌদি আরবের আল খারিজ শহরের ডাক্তার সোলাইমান আল হাবিব হাসপাতালে ১০দিন লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় আবদুল্লাহ আল মামুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিহত আব্দুল্লাহ আল মামুন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের ভরভরা গ্রামের শহীদুল ইসলাম সওদাগরের ছেলে। তার ৬ ছেলে-মেয়ের মধ্যে মামুন ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে আল তোয়াইক বলদিয়া কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জীবিকার তাগিদে প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান।
স্থানীয় ও প্রবাসী সূত্রে জানা গেছে, ইফতারের আগে শ্রমিকদের আবাসিক ক্যাম্পে হঠাৎ ইরানের একটি মিসাইল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে সেখানে অবস্থানরত শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয় আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সৌদি আরবে তার সাথে কর্মরত সহকর্মীরা তার পরিবারকে বলেন ঘটনার সময় আব্দুল্লাহ আল মামুন কর্মস্থলের ক্যাম্পেই অবস্থান করছিলেন। বিস্ফোরণের পর সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে বিভোর আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রায় ১৫ বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সর্বশেষ ৫ বছর আগে মা – বাবাসহ প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। বাড়িতে স্ত্রী শারমিন আক্তার এবং ৬ বছর বয়সী অবুঝ সন্তান মাহেদী শেখ এখন কেবলই স্বামী এবং বাবার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সামিল।
নিহত মামুনের বাবা শহীদুল ইসলাম সওদাগর বলেন, আমার দুই ছেলে দীর্ঘদিন যাবত সৌদি আরবে থাকেন। মেজো ছেলে মামুন ঈদের পর বাড়িতে আসার কথা থাকলেও লাশ হয়ে এলো।
প্রবাসে তার এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পরিবার সহ গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারসহ স্বজনরা তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এছাড়াও ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, উপজেলা
নির্বাহী অফিসার এন এম আব্দুল্লাহ আল মামুন, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা ইসমাঈল হোসেন সোহেলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিহত মামুনের বাড়িতে গিয়ে মরহুমের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানান, পাশে থাকার আশ্বাস দেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশীর একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা মামুনের এমন করুণ মৃত্যুতে গফরগাঁওয়ের ভরভরা গ্রামে এখনও শোকের মাতম চলছে।
#####