পার্বত‍্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এখনো শান্তি ফিরেনি পাহাড়ে।

শেয়ার করুন :

এম এস মনির চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব‍্যুরো প্রধান।।

খুন, অপহরণ, আটক, হয়রানি, দখল, উচ্ছেদ অব্যাহত থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরীহ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তৈরি পার্বত্যাঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। গত ২৪ বছরে আভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশেষ বাহিনী ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৭২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কোন্দল-সংঘাত বন্ধ হয়নি। ফলে শান্তি আসেনি পাহাড়ে।

সূত্র জানায়, গত দুই যুগের বেশি সময়ে সশস্ত্র সংঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ৩৮০ জন নেতাকর্মী ও সমর্থকের মৃত্যু হয়। একই সময়ে জেএসএসের প্রতিপক্ষ ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ৩৪০ জন নেতাকর্মী ও সমর্থকের প্রাণহানি ঘটে।
ভিন্ন ভিন্ন দল ও সংগঠনের নামে পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আদর্শগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত অব্যাহত আছে। তাদের মধ্যকার বিভক্তি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে এই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেএসএস চলতি বছরের জুন-আগস্ট পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার, রাষ্ট্র, বিশেষ বাহিনী, বহিরাগত, স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আগ্রাসনে পাহাড়ের জুম্ম জনগণের মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভূমি ও ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে। তাদের নির্মম, নির্দয় ও সম্প্রসম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনের কবলে পড়ে পাহাড়ের জুম্ম জনগণের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা ক্রমে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছে।
গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ৩৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ২০টি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো, ৫ জনকে সাময়িক আটক ও মারধর করা হয়। ৬ জনকে নানাভাবে হয়রানি, ৬টি বাড়ি তল্লাশি ও বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করা হয়।

একই সময়ে বিভিন্ন বাহিনী ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মদদপুষ্ট মগ পার্টি, বম পার্টি, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), প্রসিত সমর্থিত ইউপিডিএফসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী দল কর্তৃক ১৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬ জন খুন, শিশুসহ ৬ জন আহত, ১২ জন অপহরণ এবং অপহৃত ২ জনকে মিথ্যা মামলায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ছিল বম পার্টি নামে পরিচিত কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সন্ত্রাসী কর্তৃক রাঙামাটির বিলাইছড়ির বড়থলিতে একটি ত্রিপুরাপাড়ায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে নিরীহ ৩ গ্রামবাসীকে হত্যা ও ২ শিশুকে গুরুতর জখম।

মানবাধিকার বিষয়ে জেএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত। দীর্ঘ ২৪ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং সরকার, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক একের পর এক চুক্তি লংঘন এবং চুক্তিবিরোধী জুম্ম স্বার্থের পরিপন্থি নানা ষড়যন্ত্র ও কার্যক্রমের কারণে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। আদিবাসী জুম্ম জাতিগুলোর অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির সম্মুখীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী-শিশুর ওপর ৭টি যৌন ও শারীরিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ জন জুম্ম নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ জনকে দলবদ্ধ ধর্ষণসহ ২ জুম্ম নারীকে ধর্ষণ, ১ জনকে হত্যাচেষ্টাসহ ৪ নারী ধর্ষণের চেষ্টা এবং ১ জন হত্যার শিকার হন। একই সময়ে ভূমি জবরদখল, সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলার ৯টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও বহিরাগত মহল কর্তৃক জুম্মদের ওপর ৩টি সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৩৭টি জুম্ম গ্রামবাসীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, ৪ জনকে আহত, ১ট বৌদ্ধ মন্দিরে লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনাও রয়েছে।

গত জুন মাসের প্রথম থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বান্দরবানের থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুটি ইউনিয়নে অন্তত ১২ জন জুম্ম গ্রামবাসীর মৃত্যু এবং প্রায় ৩৫০ জনের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা জুম্ম পাহাড়িদের জন্য বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন।

শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করা যাবে না!!