আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)।।
ময়মনসিংহের ভালুকা ও উথুরা রেঞ্জের বিভিন্ন দাগে বনবিভাগের কোটি কোটি টাকার জমি দখলে নিয়ে একের পর এক বহুতল ভবন ও সীমানা প্রাচীর নির্মানের অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া ভূমির শ্রেনী পরিবর্তন করে একটি মহল ভেকু দিয়ে বনবিভাগের উচু টিলা কেটে নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে মাটি বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। আর এসব ব্যাপারে স্থানীয় বনবিভাগ অনেকটাই রহস্যজনক নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে সংরক্ষিত বনভূমি ক্রমান্নয়ে বিরান হয়ে জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯১ সাল থেকে ভালুকার বনভূমি জরিপ শুরু হয়। জরিপে বন বিভাগের ভালুকা ও উথুরা রেঞ্জের মোট ২৩ হাজার ৭৮ একর জমির মধ্যে ১৪ হাজার ৮৬৬ একর ৬৪ দশমিক ৪২ শতাংশ জমি চলে যায় জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে। বর্তমানে বনভূমির নামে জমি আছে মাত্র ৮ হাজার ২১১ একর। অন্যের নামে বনের জমি চলে যাওয়ায় ২০০৮ সালে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আপত্তি দেয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে গেজেট প্রকাশও বন্ধ ছিলো। কিন্তু পরে জরিপ অধিদপ্তর রহস্যজনক কারণে হঠাৎ বিআরএস জরিপের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে। যদিও পরবর্তিতে উক্ত বিআরএসর বিরুদ্ধেও আদালতে আপিল করা হয়েছে বলে বনবিভাগের দাবি। আর এই সুযোগেই শুরু হয়, দু’টি রেঞ্জেই বনভূমি দখলের মহোৎসব।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ি অফিসের সামনে ৮৭ নম্বরে দাগে একটি প্রস্তাবিত কোম্পানী কয়েক কোটি টাকার জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মান করে বেশ কিছু স্থাপনা করেছে। তাছাড়া ৭২২ নম্বর দাগে বাগান কেটে জনৈক আবুল হাশেম বাড়ি নির্মাণ করছেন। অফিসের অদূরে সিডষ্টোর বাজার এলাকায় ৯ নম্বর দাগে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি ও একই দাগে আওলাতলী রোডে আতিক নামে এক ব্যক্তি বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। ১৮৫ নম্বর দাগে ঝালপাজা সড়কের পাশে আব্দুল গফুর নামে এক ব্যক্তি বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। হবিরবাড়ি মৌজার ৮২৯ নম্বর দাগে এক প্রভাবশালী কর্তৃক বনবিভাগের কয়েক একর জমি দখলে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পরে মাপজোকের নামে স্থানীয় বনবিভাগ নিরব ভূমিকা পালন করছেন। মেহেরাবাড়ি মৌজার ৭৪ নম্বর দাগে প্রায় আড়াই একর জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীরসহ বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন এক প্রভাবশালী। বাঁশিল মৌজার ১৮৭ নম্বর দাগে উকিলের ভিটা নামক স্থানে একটি আইসক্রিম কোম্পানীর হয়ে সুরুজ ঢালীসহ বেশ ক’জন প্রভাবশালীর নেতৃত্বে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শুরু করলে বনবিভাগ তাতে বাঁধা দেন। একই মৌজার মান্দাই মার্কেটের দক্ষিণপাশে কামরুলের নেতৃত্বে রশিদ ঢালীর ছেলে আল আমিন বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। পাড়াগাঁও মৌজার ৯৫৭ নম্বর দাগে গৌরিপুর এলাকায় বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে হ্যানস্ গ্রেæপ নামে এক কোম্পানী প্রায় তিন একর জমি দখলে নিয়ে বেশ কয়েকটি বিশাল আকারের পুকুর নির্মাণ করেছেন। একই মৌজার আউলাতলী গ্রামে বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীর করে আব্দুর রাজ্জাক নামে জনৈক প্রভাবশালী সিসা ফ্যাক্টরীর জন্য ভাড়া দেয়ায় এলাবাসি পরিবেশ দূষণের প্রতিবাদে মানববন্ধন পালন করেছেন। একই মৌজার ৪৮৩ নম্বর দাগে ডিবিএল নামে একটি প্রস্তাবিত কোম্পানী সীমানাপ্রাচীরের কাজ করছে। ধামশুর মৌজার ৮৪৩ নম্বর দাগে মামারিশপুর গ্রামে বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে এক প্রভাবশালী সীমানাপ্রাচীরের কাজ করছেন। স্থানীয় বিট ইনচার্জ সাবেরুজ্জামান জানান, ডিমারগেশনের জন্য আবেদন করেই কাজ শুরু করলে তারা কাজ করতে নিষেধ করে আসেন। একই মৌজার ১২১৭ নম্বর দাগে লাবিব ফ্যাক্টরীর ২ নম্বরগেইট সংলগ্ন আলী মোহাম্মদ ভোলন নির্মাণ করছেন বসতবাড়ি।
এদিকে মনোহরপুর মৌজার ৩৭২ নম্বর দাগে বনবিজ্ঞপ্তিত রামচরনের উচু টিলাটি জনৈক মনির হোসেন তার ভেকু দিয়ে পর্যায়ক্রমে কেটে নিয়ে ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করে বিশাল জলাশয় তৈরী করেছেন। আর ওইসব মাটি স্থানীয় পলিমার বেশ কয়েকটি কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তেমনি উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় ভূমির শ্রেণীর পরিবর্তণ করে একটি মহল ভেকু দিয়ে বনবিভাগের উচু টিলা কেটে নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে মাটি বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তাছাড়া উথুরা রেঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
হবিরবাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, অবৈধভাবে গড়ে উঠা প্রতিটি ঘটনার সাথে বনবিভাগের অসাধূ ব্যক্তিরা জড়িত এবং তারা তা থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। একাধিক অভিযোগ পেলে হয়তো কোন কোন স্থাপনার আংশিক ভেঙেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। অভিযোগে জানা যায়, বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ভালুকায় কর্মরত আছেন। এই রেঞ্জের দায়িত্বে আসার আগে তিনি উথুরা রেঞ্জের আঙ্গারগাড়া বিটে বেশ কয়েক বছর বিট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেখানেও তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ছিলো।
উপজেলার বাঁিশল গ্রামে আইসক্রিম ফ্যাক্টরীর হয়ে বনবিভাগের জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকারী স্থানীয় সুরুজ ঢালী জানান, বনবিভাগের সাথে আপোষ করে সীমানা নির্ধারণের পর তারা কাজ করছেন।
মেহেরাবাড়ি মৌজার ৭৪ নম্বর দাগে সীমানাপ্রাচীরসহ বহুতল ভবন নির্মাণের ব্যাপারে হাজিরবাজার বিটের ইনচার্জ সাবেরুজ্জামান জানান, বনবিভাগের প্রায় আড়াই একর জমি দখলে নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা এনে প্রভাবশালীরা তাদের কাজ করছেন। ফলে বনবিভাগের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলকারীদেও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
ভালুকা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রইচ উদ্দিন জানান, সরকারী বনভূমি রক্ষায় তারা যথা সম্ভব কাজ করে চলেছেন। বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে বেশ কিছু আইনী ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন। এমনকি কাজচলাকালিন সময়ে শ্রমিক আটকসহ সরঞ্জামাদিও জব্দ করা হয়েছে