প্রকাশিত হয়েছেঃ জানুয়ারি ৭, ২০২৪ সময়ঃ ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)।।
ময়মনসিংহের ভালুকায় আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারী পাকা রাস্তার পাশে এবং ফসলী জমিতে গড়ে উঠা ১৫ টি লাইসেন্সবিহিন ইটভাটা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়ার মতো না হলেও রহস্যজনকভাবে বেশ কয়েটি ভাটার ছাড়পত্র নিয়ে ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ। ফলে মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (যা ১ জুলাই/২০১৪ থেকে কার্যকর) এ বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, বার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরুপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে, আবাসিক ও জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা করা যাবেনা এবং সরকারী বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে দুই কিলোমিটার দুরত্বে করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর হতে ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন বা লাইসেন্স না নিয়ে ইটভাটা চালু করা যাবেনা। আর এই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আর এসব ইটভাটা তদারকি করার জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয় বনবিভাগ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও তাদের রহস্যজনক নিরবতার কারণে ভালুকার অধিকাংশ ইটভাটা মালিক এসব আইনের তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে ফসলী জমির টপসয়েল ব্যবহার করে দেদার তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আশপাশ এলাকার আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস ও বিভিন্ন প্রজাতীয় ফলজ, বনজ গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন উপজেলার ধলিয়া পলাশতলী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পলাশতলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশ ঘেষে আনিছুর রহমানের রিফাত ব্রিক্স, সোহাগ খানের আলসাফা ও জালাল উদ্দিনের সেবা নামক লাইসেন্স বিহিন তিনটি ইটভাটা। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, আনিছ’র রহমানের রিফাত ইটভাটার চারপাশে মজুদ করে রাখা হয়েছে কয়েক’শ মন লাকড়ি। চিমনী দিয়ে প্রচন্ড বেগে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। আর সেই ধোঁয়া পাশের পূর্ব ধলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০০ শতাধিক কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীসহ আশপাশের বসতি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া উপজেলার শান্তিগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত দীপ্তি একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ও শান্তিগঞ্জ-ধলীয়া পাকা রাস্তা ঘেষে ইয়াসিনের এমবিবি ও সুলতান মিয়ার এমআরএল ব্রিক্স গড়ে উঠেছে। অপরদিকে ভালুকা-ত্রিশাল সীমান্তবর্তী বড়গাঁও গ্রামে ট্রিপল সেভেন, উড়াহাটি গ্রামে খিরুনদীর পাড়ে মনু মিয়ার এমএমআর ও ধলিয়া গ্রামে অবস্থিত দুলু চৌধুরীর মির্জা ব্রিক্সেও একই চিত্র চোখে পড়েছে।
পলাশতরী গ্রামের লোকজন জানান, ইট পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া আর উড়ে আসা ধুলাবালিতে পূর্বধলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শাবাসকষ্টজনিত অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশ। তাছাড়া ইট ভাটার বিরুপ প্রভাবে আশপাশের এলাকায় ফলজ ও সবজিসহ সব ধরণের ফসলাদি ফলানো সম্ভব হচ্ছেনা।
এদিকে সরকারী কার্পেটিং রাস্তার ৫০০ মিটারের ভেতর ভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও ভালুকা উপজেলার ভায়াবহ গ্রামে ভালুকা সখিপুর সড়ক ঘেষে এবং আবাসিক ও ফসলি জমিতে ফোকাস অটো ব্রিক্স নামে একটি ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। পরিবেশের ছাড়পত্রও দেয়া হয়েছে রহস্যজনক ভাবে। তাছাড়া ভালুকা বিরুনীয়া, মেদিলা, উরাহাটি ও শান্তিগঞ্জ সাইনবোর্ড সড়কের পাশে বেশ কয়েকটি লাইসেন্স বিহিন কয়েকটি ইটভাটা চালু রয়েছে। এদিকে গ্রামবাসির প্রতিবাদের মুখে পারুলদিয়া গ্রামের পূর্বপাশে মধূনী বিলের মাঝখানে প্রস্তুত হচ্ছে মনো মিয়ার আরো একটি ইটভাটা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলার খারুয়ালী, ধলিয়া, মেদীলা, মেদুয়ারী, ভায়াবহ, বিরুনীয়া, রাংচাপড়া, শান্তিগঞ্জ, চান্দরাটিসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৫ টি ইটভাটা। এসব ইটভাটার দু’একটি ছাড়া কোনটিরই হালনাগাদ লাইসেন্স নবায়ন নেই। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়ে থাকে এমনকি ইট তৈরীতে ৬ থেকে ৭ ধরণের ডাইস ব্যবহার করা হয় এবং ইটের সাইজ ছোট-বড় করে প্রতিনিয়তই ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান, ভালুকার দু’একটি ছাড়া কোন ভাটারই লাইসেন্স নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, প্রতিটি ইটভাটা থেকে ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারীকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়ে থাকে। জেলা প্রশাসক ও বনবিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর ম্যানেজ করে থাকেন উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির নেতারা।
উপজেলার শান্তিগঞ্জ এলাকায় দীপ্তি একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয় ও শান্তিগঞ্জ-ধলীয়া রাস্তা ঘেষে গড়ে উঠা এমবিবি নামক ইটভাটা মালিক ইয়াসিন, এমআরএল ব্রিক্স সুলতান মিয়া ও সীমান্তবর্তী বড়গাঁও গ্রামে অবস্থিত ট্রিপল সেভেন ভাটার মালিক বদল মিয়া জানান, তাদের কাগজপত্র সব ঠিক আছে। এই প্রতিনিধিকে তাদের ঢাকার অফিসে গিয়ে কাগজপত্র দেখতে বলেন।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন জানান, ভালুকায় ১৫ টি ইটভাটা রয়েছে। সার্বিকদিক ম্যানেজ করেই বরাবর যেভাবে চালানো হয়ে থাকে, এ বছরও সেভাবেই ভাটাগুলো পারিচালিত হচ্ছে। কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও গতবছর প্রশাসন তার ভাটা ভাঙচুর ও জরিমানা করে।
এ ব্যাপারে ভালুকা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ জানান, তার অফিসে ইটভাটার কোন তালিকা আছে কিনা, তা খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবেন। তাছাড়া সরেজমিন করে যে সকল ভাটায় লাকড়ি পোড়ানো হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হবে তিনি জানান।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল জানান, উপজেলার বেশিরভাগ ইটভাটারই লাইসেন্স নেই। এমনকি তারা নিতিমালারও কোন তোয়াক্কা করছেনা। রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর নির্বিকার। স্থানীয়ভাবে ইউএনও এবং বনবিভাগ তদারকি করলে হয়তো কিছুটা অনিয়ম দূর হতো।
ইটভাটা তদারকি কমিটির সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এরশাদুল আহমেদ জানান, এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার পর যেসকল ভাটায় অনিয়ম পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্রকাশক ও সম্পাদক

আসাদুজ্জামান (ফজলু)

হাউজ নং: ২০, ফ্ল্যাট নং: বি২, রোড নং: ০৭

সেকশন: ১২, উত্তরা, ঢাকা – ১২৩০

মোবাইল: ০১৭১৮-১৯২৬৮৫, ০১৭৬১-৫৮২৩৩৮

ইমেইল: contact@digontabarta.com