প্রকাশিত হয়েছেঃ এপ্রিল ২৪, ২০২৪ সময়ঃ ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)।।
ময়মনসিংহের ভালুকা পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় পুকুর জলাশয় শুকিয়ে অধিকাংশ সাবমার্সিবল নলকূপ বন্ধ হয়ে খাবার পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানির সমস্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ভালুকায় কতোগুলো সরকারী টিউবওয়েল ও তারা পাম্প অকেজু আছে, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকেীশল অফিসে তার কোনো তথ্য নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কারণে পৌর এলাকাসহ উপজেলার প্রায় গ্রামেই মোটর চালিত সাবমারসিবল পানির পাম্পের প্রচলন বেড়ে গিয়েছে। কমে গেছে চাপকলের ব্যবহার। গত কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড তাপদাহ বয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে অধিকাংশ টিউবয়েল বন্ধ হয়ে গেছে। সমস্যা সারাতে লোকজন ভীড় করছেন টিউবওয়েলের দোকানে আর দারস্থ হচ্ছেন টিউবওয়েল মিস্ত্রিদের। গত কয়েক বছর ধরে ভালুকা পৌর এলাকার বাসা বাড়িতে ব্যবহৃত উপরের লেয়ারে স্থাপনকৃত চাপকল গুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিপসেট সাবমারসিবল টিউবওয়েল ব্যবহার শুরু হয়েছে। টিউবওয়েল মিস্ত্রিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভালুকা পৌর এলাকার মেজর ভিটা, ঢালী ভবন, তোতাখাঁর ভিটায় ও টিএন্ডটি রোডে বর্তমানে পানির স্তর ৭০/৭৫ ফুট নীচে নেমে গেছে। ফলে উপরের লেয়ারে স্থাপিত বেশীরভাগ মোটর চালিত সাবমারসিবল পানির পাম্পগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। এসব সারাতে তারা দিন রাত বাসায় বাসায় কাজ করছেন। এসব কলের কোনটায় অতিরিক্ত ১০ ফুট কোনটার ২০ ফুট পাইপ সংযোজন করে পাম্প মোটর নীচে নামিয়ে পানির লেয়ারে স্থাপন করে পানি উঠাতে হচ্ছে। যাদের ৮০ ফুটের নীচে হাউজিং রয়েছে তাদের পাম্পে পানি উঠছেনা। আর যেসব সাব মারসিবল ৮০ থেকে ১২০ ফুটের হাউজিং করে মোটর স্থাপন করা আছে, শুধুমাত্র ওইসব পাম্পে পানি উঠছে। কল মিস্ত্রিরা জানান, যদিও চৈত্র মাসে খরার কারনে প্রতি বছর তাদের কাজের চাপ বেড়ে যায় এবং এ বছর তারা প্রচন্ড চাপে রয়েছেন। তারা জানান, গত ৫ বছরের মধ্যে এতো নীচে পানির স্তর কখনো নামেনি। এ সময় যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে পানির স্তর আরো নীচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন পানি সংকট ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে তারা আশংকা করছেন।
বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের পক্ষে ৪০/৫০ হাজার টাকায় একটি সাবমার্সিবল পানির কল স্থাপন সম্ভব নয়। খরা মৌসুমে এসব মানুষের খাবার পানি অন্যের বাড়ী থেকে আনতে হয়। কারন চাপ কল কিংবা টানা কলে এখন আর পানি পাওয়া যায়না। খড়ার কারনে তাপদাহ অব্যাহত থাকলে খাবার পানি ও কৃষিতে সেচ কাজ ব্যহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেকেই আশংকা করছেন। উপজেলার ভরাডোবা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড চাপরবাড়ী গ্রামের হাজী নাজিম উদ্দীন খান (৯২) জানান তাঁদের প্রায় দেড়শ বছরের পুরানো পুকুরটি খড়ার কারনে এখন প্রতি বছর শুকিয়ে যায়। এতে প্রায় ১০/১৫ টি পরিবারের লোকজন গোসল করা ও গবাদি পশু সংরক্ষনের ব্যাপক সমস্যা পোহাতে হয়। তিনি জানান শুকনু মৌসুমে পানি পেতে ভরাট হওয়া শুকিয়ে যাওয়া পুকুর গুলি পুনঃখনন কাজে সরকারী ভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষের হারানো ঐতিয্য ফিরে পাওয়া সহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
ভালুকা পৌর এলাকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাহজাহানসহ ও আশপাশের সাবমারসিবল পাম্প এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই পানি উঠা বন্ধ হয়ে যায়। মিস্ত্রি আনার পর জানাগেছে, সাবমারর্সিল মোটরটির কয়েক ফুট নীচে পানির স্তর নেমে গেছে। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, শতকরা ৬০/৭০ টি পানির পাম্পের একই অবস্থা। স্তর নীচে নামার কারনে পানি উত্তোলন করতে পারছেন না। যারা ১০০ থেকে ১২০ ফুট নীচে হাউজিং করে মোটর স্থাপন করেছেন তাদের কলে মোটামোটি পানি উঠছে। অনেকেই বলছেন, এ অঞ্চলে অপরিকল্পিত শিল্পাঞ্চয়নের কারনে এবং তারা গভীর ডিপটিউবওয়েল স্থাপন করে পানি উত্তোলনের কারনে বিগত বছর গুলোতে খরা মৌসুমে পানির স্তর সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত নামলেও তা স্থায়ী হয়নি। কিন্ত এ বছর ৭০ থেকে ৭৫ ফুটের নীচে পানির স্তর নেমে গেছে এবং এতে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। এক সময়ের ভালুকা নদী খাল বিল পুকুর আর বড় বড় বৃক্ষের সমারোহে আদ্রতায় ভরা ছিলো আবহাওয়া, জলীয় বাষ্প অনুকূল থাকায় যথা সময়ে বৃষ্টিপাত ও পুকুর খালবিলে প্রচুর পানি থাকার কারনে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক উপরে অর্থাৎ ১৫/২০ ফুটের মধ্যে স্থিতাবস্থায় থাকতো।
পরিবেশবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে নির্বিচারে এ অঞ্চলের বিশাল সরকারী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংশসহ ছোট বড় বৃক্ষ নিধনের ফলে ছায়াশুন্য মাটিতে কেবলই বাধাহীন সূর্যের তাপদাহ আর ভরাট হওয়া পানিশুন্য পুকুর নদী খাল বিল গুলো পানিশুন্য হয়ে যেন খা খা করছে। অপরদিকে একশ্রেণীর ভূমিদস্যু শিল্পপতিদের মদদপুষ্ট হয়ে স্বল্পমুল্যে জলাভূমি ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারী আইনের তোয়াক্কা না করে মাটি ফেলে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে তাতে দেদার্সে অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা স্থাপন করে পরিবেশ ধ্বংশ করছেন। যা দেখা বা প্রতিরোধের কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কোন সংশ্লিষ্ট মহল। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কৃষি সেচে ব্যবহৃত গভীর নলকূপ ছাড়াও কয়েক’শ মিল ফ্যাক্টরীতে শক্তিশালী গভীর নলকূপ দিয়ে দিন রাত পানি উত্তোলন করার কারনে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের আরো অবনতি হচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী পলাশ সরকার জানান, ভালুকায় অসংখ্য ডাইং কারখানায় প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার পানি ব্যবহার করার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সম্প্রতি উপজেলার ডাকাতিয়া ডালুয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি নলকূপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পানির স্তর অনেক নিচে চলে গেছে। আগে সরকারী টিউবওয়েলগুলোর হাউজিং দেয়া হতো ৮০ ফুট, তা বর্তমানে ১৬০ ফুট দেয়া হচ্ছে। তবে ভালুকায় কতোগুলো সরকারী টিউবওয়েল ও তারা পাম্প অকেজু আছে, তার তার জানা নেই।

