জালালুর রহমান, মৌলভীবাজার।।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অনুমোদিত ৪০৯টি পদের বিপরীতে ১০৩টি পদ শূন্য রয়েছে। উপরন্তু, কয়েকজন ডাক্তার ও কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, ৫-জন কর্মকর্তা অন্যত্র প্রেষণে কর্মরত থাকা ও ৮-জনের শিক্ষা ছুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল থাকার তথ্য মিলছে। তাই জেলার সর্বাধুনিক হাসপাতালটির স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ও রোগ নির্ণয় কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ প্রকাশ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে “৮৩-টি ডাক্তার পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৪০ জন ডাক্তার। গত ০১/০৩/২০১৭খ্রি. থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ৪৩টি চিকিৎসক পদ শূন্য। নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট ১টি সহ ১ম শ্রেণীর ৪৪ টি পদ শূন্য রয়েছে তবুও ঊর্ধতণ কর্তৃপক্ষ উদাসীন”
শূন্যপদের তালিকায় রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্টের ৭টি পদ। এর মধ্যে চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, সার্জারি, গাইনী রোগ বিশেষজ্ঞ, কান, নাক ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও জুনিয়র কনসালটেন্ট ২টি (প্যাথলজি ও চক্ষু), মেডিকেল অফিসার ১টি, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৬টি, সহকারী সার্জনের ২৫টি পদ, প্যাথলজিষ্ট ১টি, এমও ইউনানী ১টি, নার্সিং সুপারিনটেনডেন্টের ১টি পদ শূন্য রয়েছে।
সদর হাসপাতালে ৯ জন চিকিৎসক এটাচমেন্টে কর্মরত। ১-জন মেডিকেল অফিসার চলমান ১০ বছর ধরে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত! এত দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এ নিয়ে জনমনে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে। ১জন কনসালটেন্ট স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য প্রক্রিয়াধীন ও একই সঙ্গে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত! ১জন সহকারী সার্জন অননুমোদিত অনুপস্থিত এবং ১জন সহকারী রেজিস্ট্রার অন্যত্র প্রেষণে কর্মরত থাকার তথ্য মিলেছে। সহকারী রেজিস্ট্রারের প্রেষণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট পদটি বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে, সেটিও জনমনে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ২য় শ্রেণির কর্মকর্তা পদে ১৬টি পদে ঘাটতি বিদ্যমান। ২য় শ্রেণির কর্মকর্তাদের ১৮৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১৭১ জন কর্মরত রয়েছেন। শূন্যপদের মধ্যে ১টি উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়ক, ১টি নার্সিং সুপারভাইজার, ১টি অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ১টি মিডওয়াইফ পদ, ৫টি সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ৮টি স্টাফ নার্সের পদ শূন্য রয়েছে।
উপরন্তু, ২য় শ্রেণির ৫ জন কর্মচারী অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত, ৪ জন অন্যত্র প্রেষণে এবং ৮ জন শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে। তাঁরা কোন কোন পদে কর্মরত, কতদিন ধরে অনুপস্থিত এবং তাঁদের অনুপস্থিতি ও প্রেষণের ক্ষেত্রে যথাযথ সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না সেটিও জনমনে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তৃতীয় শ্রেণির ৫৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩৮ জন ও ১৬টি পদ শূন্য। শূন্যপদের তালিকায় ওয়ার্ড মাস্টার ১টি, হেলথ এডুকেটর ২টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রেডিও ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফিজিও ২টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ল্যাব ২টি, মেডিকেল টেকনিশিয়ান বায়োমেডিকেল ১টি, মেডিকেল টেকনিশিয়ান ইকো ১টি, মেডিকেল টেকনিশিয়ান ডায়ালাইসিস ৩টি, ফার্মাসিস্ট ১টি, স্টোর কিপার ১টি ও ড্রাইভার ১টি শূন্যপদ রয়েছে।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৩য় শ্রেণির একজন স্টুয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।“স্টুয়ার্ড”কতদিন ধরে অনুপস্থিত এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১০ জন। এ শ্রেণিতে ১৩টি পদ শূন্য থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে এমএলএসএস ৭টি, স্টেচার বেয়ারার ১টি, কুক ৩টি, ওয়ার্ডবয় ১টি ও ডোমের ১টি পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে ৪র্থ শ্রেণীর ৬১টি আউটসোর্সিং পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৪৭ জন। এখানেও ১৪টি পদ শূন্য রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।
জনবল সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সংকট এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী হাসপাতালের একটি ডিজিটাল এক্সরে মেশিন অকেজো হয়েছিল। দীর্ঘদিন পরে ১টি ডিজিটাল ও ২টি অ্যানালগ এক্সরে মেশিন সচল থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মৌলভীবাজারে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ডায়ালাইসিস ইউনিট নিয়েও রয়েছে তেলেসমাতি। ২০১৪ সালে নেগেটিভ রোগীদের জন্য এবং ২০১৭ সালে পজিটিভ রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস কার্যক্রম চালু হয়েছিল। বর্তমানে ১৭টি বেডের মধ্যে দুটি বেড অচল থাকার তথ্য মিলেছে। ফলে ডায়ালাইসিসের সক্ষমতা ও রোগীর চাপের সঙ্গে বিদ্যমান অবকাঠামোর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা ঊর্ধতণ কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০১৫ সালের ১১ আগস্ট সিটি স্ক্যান চালু হয়েছিল। বর্তমানে সিটি স্ক্যানের ১টি বেড সচল থাকার তথ্য মিলেছে। একইভাবে ২০১৭ সালে স্ক্যানো সেবা কার্যক্রম চালু হওয়ার পর মোট ১৬টি বেডের মধ্যে ১১টি সচল এবং ৫টি বেড অচল রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ডাক্তার, কর্মকর্তা – কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এবং চলমান জনবল সংকটে ঊর্ধতণ কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার প্রণয় কান্তি দাশ জানান গত সোমবার ১জন উপসচিব এসেছিলেন ও রবিবার বিভাগীয় পরিচালক এসেছিলেন। ওরা (অনুপস্থিত ৩-জন ডাক্তার) চাকুরি ছাড়ার আবেদন দিয়েছেন। ডাক্তার শাহিনা আক্তার ২০১৭ খ্রি. থেকে আমেরিকায়, ডাক্তার সৈয়দা মাখলুকা মোর্শেদ ও ডাক্তার আশফাক উল আলম চাকুরি ছাড়ার জন্য আবেদন করেছেন। ২জনের মধ্যে ১জন লন্ডন ও ১জন আমেরিকায় অবস্থানরত। জনবল সংকটের বিষয়ে স্ব্যাস্থ্য মন্ত্রীর সাথে গত শুক্রবারের সভায় মন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন “ডাক্তার ৫ হাজার নিয়োগ হচ্ছে ও সাড়ে ৩ হাজার নার্স নিয়োগ হচ্ছে, নিয়োগ হলে আপনারা পাবেন।’অকেজো চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত বিষয়ে ডাক্তার প্রণয় বলেন, পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন চাহিদা পাঠিয়েছি, তাই নতুন যন্ত্রপাতি দেয়া হবে।